গণতন্ত্রে পৌঁছানোর পথ ছাত্র সংসদ


রাজীব দাস
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ

ইতিহাসে বাংলাদেশের যা কিছু মহান অর্জন তা মূলত ছাত্রদের ইতিহাস। বাংলাদেশের এমন কোন সফল আন্দোলনের খোঁজ পাওয়া যাবে না যেখানে ছাত্রদের শ্রম, ঘাম আর রক্তের দাগ নেই। মূলত সেইসব রক্তের উপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছি আমরা। আমাদের বায়ান্ন, বাষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তর রচিত হয়েছে ছাত্রদের হাতে। ছাত্রদের ত্যাগ পরবর্তীতে স্বৈরাচার পতন করে রাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে ছিলাম আমরা ছাত্ররা। নব্বইয়ের পরবর্তী ছাত্র সংসদের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করা না গেলেও নব্বই পূর্ববর্তী ইতিহাস থেকে বুঝা যায় ছাত্র সংসদের ভূমিকাই ছিলো মূলত বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক। ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসু ছিলো সবার উপরে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর অচল হয়ে থাকা ডাকসু আবার সচল হওয়ার পথে। এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রের সংবিধান নৈতিক-অনৈতিকভাবে অনেকবার সংশোধন হয়েছে। মূলত এটাকে সংশোধন না বলে ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছে মত পরিবর্তন বলে ধরে নিলেও ভুল হওয়ার কথা না। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি হয়েছে অনেকগুন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় শুধুমাত্র এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের মধ্যে কোন পরিবর্তন বা পরিমার্জন নিয়ে আসা হয়নি। কারণ এতদিন ক্ষমতাসীনরা এই ছাত্র সংসদকে তাদের ভয়ের এবং ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার কারণ মনে করে এসেছে।
এখনও যে ভয়ের কারণ মনে করছেন না এটা ভাবার কোন কারণ অবশ্য নেই। তবে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থায় এসে তারা আজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত দশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ক্ষমতাসীনরা তাদের দখলের আওতায় নিয়ে আসতে পারেনি। সিনেট থেকে সিন্ডিকেট কোন জায়গায়ই এখন আর কোন সিদ্ধান্ত নিতে বিভেদ তৈরি হতে দেখা যায় না। কিছু বিভেদ তৈরি হয় কেবল তাদেরই অন্তঃকোন্দলের জের ধরে, কার থেকে কার সুবিধা বেশী হয়েছে এসব নিয়ে। হলগুলোর দায়িত্বে থাকা প্রভোস্ট থেকে হাউজ টিউটর সবাই এখন ক্ষমতাসীনদের মধ্যে কে কাকে বেশী সুযোগ দিবে সেই তাড়াহুড়ো নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এই জন্যই আমরা আজ দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে পর্যন্ত হাতাহাতি হয়েছে বহুবার।
তবে ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতার দাপট যতই দেখাক না কেন, এদেশের ছাত্র সমাজ কখনোই তা নিশ্চুপ হয়ে মেনে নেয়নি। এই পিছনে ফেলে আসা ২৮ বছরের অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে ছাত্রসমাজের যে চেষ্টা তা সবসময় প্রশাসনের সাথে তাল মিলিয়ে ভন্ডুল করতে চেয়েছে তারা। অনেকাংশে তারা সফল হয়েছেও। কিন্তু এদেশের ছাত্ররা কখনোই ক্ষমতার কাছে ন্যায্যতার প্রশ্নে আপোষ করেনি, এবারও করবে না। ইতিহাস এই ইঙ্গিত দেয়। এ' ইঙ্গিত সামনে রেখেই আসন্ন ডাকসু আবারও সেই উত্তাল সময়ের ছাত্র রাজনীতির হাতে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশ্যা রাখলেও, লক্ষ্য করলে দেখা যায় ক্ষমসীনরা তাদের রণকৌশল পাল্টেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ তে অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতই একটি ফিক্সড ডাকসু নির্বাচন সরকার জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তার কারণ হিসেবে আমরা আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে প্রশাসন, যাকে মূলত সরকারের অংশ বলেই ছাত্র সমাজ বিশ্বাস করে, তারা আজ শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও ভয়মুক্ত করার তাগিদ থেকে যে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছে তার সবকটিই প্রায় কোন আলোচনা বা যৌক্তিক বিচার বিশ্লেষন ছাড়াই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি দাবী ছিলো ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের পুরোনো রীতি পালটে ভোটকেন্দ্রগুলো হলের বাইরে নিয়ে আসার। কারণ গত দশ বছর ক্ষমতায় থেকে তারা প্রশাসনকে কখনো সুবিধা দিয়ে কখনো বেকায়দায় ফেলে হলগুলোকে নিজেদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে, থাকতে দেওয়ার মত "মহানুভবতা" দেখিয়ে তারা হলগুলোকে করে রেখেছে টর্চার সেল। এছাড়া গেস্টরুমের নামে ম্যানার শেখানোর কায়দায় তারা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদেরকে এতটাই নির্যাতন করে যে সে একসময় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘৃণা করতে শুরু করে। এইসব কারণে হলের বাইরে অবস্থানরত প্রায় পঞ্চাশ ভাগেরও বেশী শিক্ষার্থী হলে কোন প্রশাসনিক কার্যক্রম ছাড়া আসা যাওয়া করতে ভয় পান। এইসব প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্রিয় প্রায় সবগুলো ছাত্র সংগঠন হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের দাবী জানালে প্রশাসন তা গ্রাহ্য করেনি। উল্টো ক্ষমতার মোহে পড়ে তারাও এখন কথা বলছে সেই ক্ষমতসীনদের মত করেই।
তাই প্রত্যাশার সাথে আশঙ্কাও বিরাজ করে এই পাতানো নির্বাচন দিয়ে সরকার যে গণতন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা দাড় করাতে চাচ্ছে তার ফলাফলে তারা নির্যাতনের বৈধ সার্টিফিকেট পেয়ে যায় কী না।
ডাকসু মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলেও তার পরিধি কোনভাবেই শাহবাগ থেকে নীলক্ষেত নয়। বরং সারা বাংলাদেশ বিস্তৃত। তাই ডাকসু হয়ে গেলে সারা বাংলাদেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে প্রশাসন। কিন্তু সেটা যেন কোনভাবেই পাতানো বা সাজানো না হয় সেই বিষয়ে ছাত্র সমাজকে দৃষ্টি রাখতে হবে। যদি হয় সেটা প্রতিহত করতে হবে ছাত্রদেরই। কারণ এটাই হতে পারে বাংলাদেশের নির্যাতনতন্ত্রের ধারা থেকে পুনরায় গণতন্ত্রে পৌছানোর অন্যতম পথ।

Comments