মুক্তি


নুসরাত জাহান মিম
' জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব '। আজকের সকল নারীর শত বিপত্তি কে এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার আদর্শ মহীয়সী নারী,বেগম রোকেয়ার বিখ্যাত এই বাক্যত্রয়ের মধ্যে নারীর মুক্তির ধারা ফুটে ওঠে বারবার। আজ নারী একদিকে যেমন মা, অন্যদিকে সে অফিসের উর্ধতন কর্মকর্তা। নিপুণ দক্ষতায় সবদিক সামলান ভালবেসে। নারী আজ স্বাবলম্বী, নিজেই উপার্জনে সক্ষম। কিন্তু স্বাধীন কতখানি? আর্থিক স্বাবলম্বনই কি কেবলমাত্র নারীমুক্তির ধারক হতে পারে? তবে এখনো কেন স্বামী ঘরে ফিরে বিশ্রাম নেয় আর স্ত্রী ঘরে ফিরেই রান্নাঘরে যায়? আজো আমাদের মেয়েরা যেখানে সীমাবদ্ধ তা হল মানসিকতা। মানসিকতার উন্নয়ন কেবলমাত্র নারীকে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। ' যতই শিক্ষিত হও না কেন, দিনশেষে খুন্তি নাড়তেই হবে ' - এই ধারনা থেকে বেরিয়ে এসে যতদিন না নারী এটা বুঝতে শিখছে যে খুন্তি নাড়া বা রান্না করা তার দায়বদ্ধতা নয় বরং নারী কিংবা পুরুষ উভয়কেই নিজের কাজ নিজে করতে শেখা উচিত ততদিন নারীমুক্তি অসম্ভব। নারীমুক্তি মানেই পুরুষের মত রাত বারোটায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে পারা নয়, অর্থাৎ   নারী ও পুরুষের উভয়ের ধুমপান থেকে বিরত থাকা উচিত এবং পাশাপাশি অবশ্যই নিয়মমাফিক জীবন যাপনে উদ্যোগী হওয়া উচিত। নারীমুক্তি মানে নারী কি করবে বা করবে না তা অবশ্যই তার সিদ্ধান্ত নিতে পারার স্বাধীনতা এনং তার আগে দরকার মানসিকতার উন্নয়ন যা নারীর হাজার বছরের বন্দীত্ব হতে মুক্তির পথ দেখাতে পারে।
কি রাস্তায়, কি সোশ্যাল মিডিয়ায়, এমনকি নিজের বাসায় পর্যন্ত নারীকে নির্ধারণ করে দেয়া হয় সে কি পড়বে বা কি পড়বে না, কিভাবে হাঁটবে, তার চুলের দৈর্ঘ্য বা রং কি হওয়া উচিত, তার উচ্চতা কম হলে কিত ইঞ্চির জুতো পড়ে নিজের উচ্চতা বাড়ানো উচিত, নারীর কখন কি খাওয়া উচিত কিংবা তার কিভাবে হাসা উচিত, কিভাবে কথা বলা উচিত ইত্যাদি। অথচ প্রতিটা বিষয় অত্যন্ত স্বাভাবিক কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এটা একটা নিয়ামক - নারীকে নির্ধারণ করে দেয়া। যে বা যেসকল নারী এসব নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলেন, তারা তথাকথিত ভদ্র ও শুদ্ধ নারী এবং নিয়ম অমান্যকারী সকল নারী নষ্টা, বেহায়া এবং কুলোটা। মূলত পুরুষের এটি একটি ভয়ের কারণ, সে ভয় পায় নিজের ক্ষমতা, শক্তি করতে না পারার! যদি নারী কখনো পুরুষের সমকক্ষ হয়ে ওঠে তখন সে নারীকে সহ্য করতে সমাজের সমস্ত বর্বর ও কালাকানুন কারন পুরুষ তখন নিজেকে অসহায় ও নারীর বিপরীতে দুর্বল মনে করে। যখন নারী পশ্চিমা পোষাক পরিধান করে, তখন তাকে অকথ্য গালি শুনে যেতে হয়। তার মানে এই নয় যে ঐ নারী খারাপ, এর মানে এই যে সেসকল পুরুষ ভীতসন্ত্রস্ত।
আত্মসম্মানবোধহীনতার কারনে নারী এখনো পরাধীন কারন তারা নির্যাতিত হয় নিজেকে রোজ বিক্রি করে দেনমোহর কিংবা পণের অর্থের বিনিময়ে। সার্টিফিকেট তো নারী অর্জন করে, কিন্তু মানসিকতা বদলায় না; সেলাই তো নারী শিখে নেয়, কিন্তু নিজের জীবনের জোড়াতালি দেয়াতেই তা ফুরিয়ে যায়; আলু-পেঁয়াজ রোজ টুকরো টুকরো করে, ঠিক নিজের স্বপ্নের মত। এমনি করে কত সরস্বতী রোজ মরে যায়, কেবলমাত্র লক্ষী হয়ে ওঠার ছলনায়। রুপ আর গুণ প্রমান করতে গিয়ে নিজের যোগ্যতা আর আহ্লাদের বিসর্জন দিয়ে দেয়।
কেবলমাত্র যখন নারী দূর্গা হয়ে উঠতে চায়,  তখন সমাজ রূপ নেয় মহিষাসুরের এবং তাকে তকমা দেয় যোগিনীর। এমনকি তার পরিবার, তার চরিত্র, তার আচার, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে অযাচিত প্রশ্নে জর্জরিত করা হয়। কিন্তু নারী আজ যেমন শিক্ষায়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তেমনি সমাজের এসব অযাচিত বিষয়গুলোকে পাশ না কাটিয়ে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে। অর্থাৎ নারীকে ' না ' বলা শিখতে হবে। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার নিয়মের বিরুদ্ধ চারণ করতে হবে।
ধরা যাক, কাউকে মাসখানেক একটি সঙ্গহীন ঘরে বন্দি করে রাখা হল। জানালা দিয়ে সে রোজ বাইরের প্রকৃতি দেখে, অনুভব করে কিন্তু তাকে ছুঁতে পারে না কারণ চারিপাশে তার বন্দীত্বের শিকল। নারীর অবস্থানকে ঠিক একইভাবে বর্ননা করা যায় কারণ নারীর চারিপাশে নিয়মের শৃঙখলা রয়েছে এবং এই নিয়মের বেড়াজালে সে নিজের স্বাভাবিক জীবন যাপনে রোজ নিগৃহীত হয়। তাই, নারীর স্বাধীনতার একমাত্র নিয়ামক নিজেকে এবং নিজের মানসিকতাকে উন্নত করা। পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার পাল্লায় না পড়ে নিজের নিজস্বতাকে আরো উড্ডীয়নশীল করা। এই উন্নতির পথে সমস্ত বাঁধা তা যে দিক দিয়ে বা যেভাবেই আসুক না কেন, তাকে জয় করা এবং নারীর স্বাভাবিক চলার পথকে সুগম করা।
পথ চলতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে, বাসের ভীড়ে, বাসার বারান্দায় যখন নারী নিজেকে খোলামেলা প্রদর্শন করে তখন যেসকল পুরুষ তার উদ্দেশ্যে কুরুচিপুর্ণ মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়, তখন একবারের জন্যেও নিজেকে অপমানিত না ভেবে ঘুরে দাঁড়িয়ে সেই পুরুষের গালে চপেটাঘাত করতে দ্বিধা করতে নেই। চপেটাঘাত মানে জানেন তো, কষে চড় মারা।

নুসরাত জাহান মিম : সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বরিশাল মহানগর সংসদ

Comments