নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা


কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। (অক্টোবর ১৯,১৯২৪ - ডিসেম্বর ২৫, ২০১৮)

বড়দিনে রোদ্দুরের দেশে চলে গেলেন অমলকান্তির স্রষ্টা কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন তিনি। ভর্তি ছিলেন আর এন টেগোর হাসপাতালে। তাঁর লেখা 'উলঙ্গ রাজা' কবিতায় মজার ছলে সামনন্ততান্ত্রিক মো-সাহেবি তথা পূর্ণাঙ্গ  সমাজব্যবস্থাকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছিলেন তিনি। যা সমাদৃত হয়েছিল সমাজের সমস্ত মহলেই। ১৯২৪ সালের ১৯ অক্টোবর অবিভক্ত ভারতের ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন নীরেন্দ্রনাথ। পাঠশালায় গুরুমশাইয়ের ছত্রছায়ায় প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে ১৯৩০ সালে কলকাতায় আসেন তিনি। মিত্র ইনস্টিটিউশনে স্কুলের পড়াশোনা সেরে প্রথমে ভর্তি হন বঙ্গবাসী কলেজে। তারপর সেন্ট পলস কলেজ থেকে পাশ করে ১৯৫১ সালে কর্মজীবন শুরু করেন আনন্দবাজার পত্রিকায়।

দীর্ঘদিন ধরে আনন্দমেলা পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব সামলেছেন নীরেন্দ্রনাথ। আনন্দমেলা পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তিনি। ওই আনন্দমেলার জন্যই  বাংলাভাষায় প্রথম 'টিনটিন' অনুবাদও তাঁর। কবি সত্তাটির সঙ্গেই তাঁর মধ্যে ছিল আরও বহু শৈল্পিক সত্তার অবস্থান। প্রাবন্ধিক,ছড়াকার, গোয়েন্দা গল্পাকার,শিশুসাহিত্যিক,ভ্রমণ কাহিনীর লেখক এবং অবশ্যই দক্ষ সম্পাদক।
কবির প্রতিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে ছেলেবেলা থেকেই। তাঁর লেখা কবিতার বই  'নীল নির্জনে' প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। সেই সময় ৩০ বছরের যুবক কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এরপর অন্ধকার বারান্দা, নিরক্ত করবী, নক্ষত্র জয়ের জন্য, আজ সকালে প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ সালে বিশ্ব কবিতা সম্মেলনে ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।

তাঁর লেখা 'উলঙ্গ রাজা' কবিতায় সামন্ততান্ত্রিক জমিদার জোতদার  সমাজ ব্যবস্থাকে তীব্র কটাক্ষের বাণে বিদ্ধ করেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কবিতার শেষ লাইনে লেখা 'রাজা তোর কাপড় কোথায়' লাইনটি আজও ঘোরাফেরা করে লোকমুখে। কবির লেখা 'কলকাতার যিশু' পাঠক মহলে জনপ্রিয়তা লাভ করে।  নিজের চারপাশে যা ঘটছে তা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরতেন কবিতার ছন্দে। কলমের খোঁচায় উঠে আসত শহরের ফুটপাথবাসী উলঙ্গ শিশুর কান্নার কথা, জ্যামে ফেঁসে থাকা কলকাতার বাস চালকের বিরক্তিকর দাঁত ঘষটানি...আসলে উঠে আসত এক আস্ত হাসি-কান্না-রাগ-বিষণ্ণতা মেশানো জীবনের গল্প। যা আনুষ্ঠানিকভাবে থেমে গেল আজ। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর কয়েকটি কবিতা সংকলন করলাম আমরা

অমলকান্তি

অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।

আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।

আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।

আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।

হেমলতা

কিছু কথা অন্ধকারে বিদেশে ঘুরছে,
কিছু কথা বাতাসে উড়ছে,
কিছু কথা আটকে আছে পাথরের তলে,
কিছু কথা ভেসে যাচ্ছে কাঁসাইয়ের জলে,
পুড়তে-পড়তে শুদ্ধ হয়ে উঠছে কিছু কথা।

হেমলতা,
তুমি কথা দিয়েছিলে, আমি দিতে এখনও পারিনি,
তাই বলে ছাড়িনি
আজও হাল।

বাতাসে আগুনে জলে উদয়াস্ত আজও মায়াজাল
টেনে যাচ্ছি, জোড়-মেলানো কথা
যদি পাই, তোমাকেই দেব। হেমলতা,
এক্ষুনি ভেঙে না তুমি ঘর।
ধৈর্য ধরো, ভিক্ষা দাও আর মাত্র কয়েকটি বছর।


উলঙ্গ রাজা

সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ!
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম , চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়।
গল্পটা সবাই জানে।
কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে
শুধুই প্রশস্তিবাক্য-উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ
স্তাবক ছিল না।
একটি শিশুও ছিল।
সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু।
নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়।
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু;
জমে উঠছে
স্তাবকবৃন্দের ভিড়।
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না।
শিশুটি কোথায় গেল? কেউ কি কোথাও তাকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায়
লুকিয়ে রেখেছে?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর
নির্জন নদীর ধারে, কিংবা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায়?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?

Comments