| অলংকরণ : রোজলীন দীপা |
উম্মে আওয়ারা
অরুণিমা চট্টোপাধ্যায়। ছোট্ট করে ডাকে অনু। সদ্য শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে উঁকি মারছে সময়। মাতৃহীন এই মেয়েটির আজ বিকেলের লগ্নে বিয়ে। যে বিকেল টায় অনু, সেহেলিদের সাথে খেলায় মত্ত থাকে, আজকের এই বিকেলবেলা কনে সেজে সাত পাক ঘুরবার অপেক্ষায় বসে আছে।
তাদের সমাজে ৮ বছর থেকেই গৌরিদান এর সময় হলেও বাবার নিতান্ত ইচ্ছেতে সমাজ পতিদের অবজ্ঞা করে ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে সে। এই পৌষেই তার ফাইনাল পরিক্ষা,সেটা হয়ত আর দেওয়া হবেনা।
সমাজে চলতে হলে কিছু নিয়মের বেড়ি পড়তে হয় সবাইকেই, ৪ বছর হেলা ফেলা করে মেয়েকে পড়াতে পারলেও এবার আর রক্ষে নেই অনুর বাবা রামাকান্তের।
১১ পেরিয়ে ১২ ছুই ছুই। কতদিন আর মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রাখবে রামাকান্ত মশাই? হাল ছেড়ে তাই পুরোহিতের চেনা জানা পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক পরিবারের সাথে পাকা কথা সেরে এসেছিলেন তিনি।
সুকান্ত সাহা; সুপাত্র, বয়সের হিসেব করা ঠিক হবেনা। চমৎকার দেহসৌষ্ঠব সম্পন্ন উচু বংশের কনিষ্ঠ পুত্র। নাম মাত্র পন নিয়ে গৌরিদান এর বয়স পেরিয়ে যাওয়া অনু কে সে বিয়ে করতে এসে বেজায় খুশি। বয়স নাহয় ১১ ই হলো? ক্ষতি কি? তার ও তো নেহাত কম নয়!
মা শত বার না না করছিলো যদিও। তাতে কি?
ঘরে লক্ষি এলে সব থেমে যাবে।
চারদিক অন্ধকার হবার আগেই বিয়ে টা সম্পন্ন করে অনুকে নিয়ে রওনা হল বরপক্ষ। বিয়ের মর্মার্থ বোঝার আগেই মাথায় চওড়া করে সিদুর দিয়ে কেউ একজন তার স্বামি পরমেশ্বর হয়ে বসে আছেন।
খুব ভয় হচ্ছে অরুণিমার। মুখ তুলে তাকাতে পারছেনা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা সুকান্তের দিকে। সুকান্ত অনুকে দেখেই যাচ্ছে। তার ভাল লাগা কাজ করছে এই মেয়েটিকে ঘিরে। স্বপ্ন দেখছে জেগে জেগেই। সারা ঘর তার মাতিয়ে রাখবে এই মেয়েটি। সে আরৎ থেকে ফিরলে গামছা নিয়ে এগিয়ে আসবে ঘাম মুছে দেবার জন্যে। সব কিছু ভাবতে ভাবতেই বাড়ির কাছে এসে পড়লো গরুর গাড়ি।
সমস্ত আয়োজন রীতিনীতি মেনে আজকে অরুণিমা আর সুকান্তের ফুলশয্যা। ভোর রাতে ঝড়ে আহত হওয়া টুনটুনির মতো অনু ঘুমিয়ে পড়েছে।
দিন কাটছে, মাস পেরুচ্ছে।
সুকান্তের সংসার সামলাতে সামলাতে অনু অনেক টা ই বড় হয়ে উঠছে। সংসারি হয়ে উঠেছে আজ কাল। রাত হলে সুকান্তের বুকে শুয়ে গল্প শুনতে ইচ্ছে করে। গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে করে। একহাত ঘোমটা দিয়ে বারো হাত শাড়ি গায়ে পেচিয়ে থাকতে ভাল লাগেনা অনুর। তবু ও বন্দিনী হয়ে সংসার এ তাল মেলাতে হয় তার।
সকালে যখন দল বেধে ছেলেরা স্কুলে যায় অনু চেয়ে চেয়ে দেখে। তার বই গুলো বাবার বাড়িতেই রেখে আসতে হয়েছিলো। পড়তে তার খুব ভাল লাগতো, ইচ্ছে করে আবার সুর করে পড়া আওড়াতে-স্কুলের বারান্দায় দৌড়ে বেড়াতে। সুকান্তের সামনে তার ইচ্ছের কথা বলা হয়ে উঠেনা। সুকান্ত বড্ড ব্যাস্ত আজকাল। এবাংলা ওবাংলা ঘুরে ঘুরে ব্যাবসা বাড়াচ্ছে।
গ্রামে দাঙা চলছে, এক রাতে সুকান্তকে ডেকে নিয়ে গেল কিছু লোক, দুপুরেও না ফেরায় চিন্তিত হয়ে বড়দাদা বেরুলো সুকান্তের খোজে। চারদিকে খোজ খোজ রব, অবশেষ এ দুই গ্রাম পড়ে নদির কিনারে সুকান্তের লাশ ভেসে উঠেছে।
সারা বাড়িতে মাতম উঠেছে। সুকান্তের মা বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। বড় দিদি আর বৌদিরা চিৎকার করে কাঁদছেন। কাঁদছেন পাশের বাড়ির ঠাকুমাও, যিনি সুকান্ত কে নিজের নাতির মতোন ভালবাসতেন। দূরে দাঁড়িয়ে কতক লোক, সুকান্তের পাড়ার বন্ধুরা। নিমাই দা চোখ মুছছেন সবার অলক্ষে, সুকান্তের সব চেয়ে কাছের বন্ধু।
অনু বসে আছে স্বামীর লাশের সামনে। নির্বাক হয়ে আছে সে, বিয়ে কি বোঝার আগেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়েছিল তাঁকে। স্বামী, সংসার এর মর্ম বোঝার আগেই স্বামীকে হারাতে হল। সব কেমন যেন দুঃস্বপ্নের মতোন ঘটে যাচ্ছে।শ্মশানে চিতা সাজানো হচ্ছে। প্রথমে সুকান্তকে তার পর অরুণিমা কে।
সপ্তদশ শতাব্দী, হিন্দু বিধবাদের সহমরনে যেতে হয়।নিজেকে সতী রাখার জন্য। সতী মানে কী? অরুণিমা তাও বোঝেনা।
অরুণিমার বাবা মারা গেছিলেন বিয়ের মাস ছয়েকের মাথায়। তাই তার জন্য কাঁদবার কেউ নেই।চারদিক তাকিয়েও কাউকে খুজে পাচ্ছেনা অনু।
অনুকেও সাজানো হচ্ছে, ঠিক বিয়ের বিকেলের মতোন করে।আজও তার মাথায় চওড়া সিদুর একে দিয়েছেন মহিলারা।
সুকান্তের চিতা জ্বলছে। তার আচ খানিক টা এসে লাগছে অনুর গায়ে, তার কোনো ভাবান্তর নেই।
শাশুড়ি একটা সন্তানের কামনা করেছিলেন। তার গর্ভে অনাগত সন্তান। সুকান্তকেও বলা হয়নি কথাটা, সেদিন ই মাত্র অনুধাবন করতে পেরেছিল অরুণিমা। শরীরের মাঝে কেউ আছে, কেউ আসছে কোল জুড়ে। কত কথাই বাকি রয়ে গেল সুকান্তের সাথে। আজকের দিনে আর কেউ নাই বা জানুক কথাটা। ক্ষতি কি!
তাঁর কান্না আসছে, অনাগত কারো জন্য মায়া বেড়েই চলেছে। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
অরুণিমার ডাক পড়েছে।মেয়েরা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
দূরে, অনেক দূরে। অন্য কোনো জনমে হয়ত তার সব না বলা কথা গুলো মুখ ফুটে বলতে পারবে সুকান্ত কে। সুকান্ত যে তার পরমেশ্বর! সাত টি জনম আরো বাকি রয়ে গেছে!
Comments
Post a Comment