একুশের অহংকার

আমি নিলুফার ইয়াসমিন। বয়স এখন ৮৩ ছুঁই  ছুঁই।  চোখটা একেবারে অচল হয়ে গ্যাছে। সব কিছু কেমন আবছা! চোখে কিছু দেখিনা বলেই হয়ত আজ কাল কেবল পুরোনোদিনের স্মৃতি গুলোই হাতড়ে বেড়িয়ে সময় পাড় করি। হুইল চেয়ার ই আমার চলার সঙ্গি।
বয়স হলে মানুষ গুলো কেমন বোঝা হয়ে যাই! একটা সময়ের পরে সন্তান গুলো যেন আমাদের মৃত্যুর অপেক্ষা করে থাকে।
ছেলেটা আমার এখন অবসরপ্রাপ্ত চাকুরীজীবী। একা হাতে সারা দুনিয়ার সাথে লড়াই করে জামিল কে আমি তিল তিল করে শুদ্ধ মানুষ করে তুলেছিলাম। জন্মের পর থেকে দেশের উথালপাতাল হাওয়ায় হারিয়ে যেতে দেইনি জামিল কে। আঁচলে শক্ত করে আগলে রেখেছিলাম বাছা টা কে আমার। ওর বাবার মত সময়ের প্রয়োজন এ হারাতে চাইনি আমি জামিল কে।
ছেলেটা আমার বড়ই মা ভক্ত। হবেনা কেন? বাবা কে তো পায়নি কখনো কাছে। মা কে ই তাই প্রাণ উজাড় করে ভালবাসে। হয়ত আমার সংসার টায় জামিল ই আমায় একমাত্র ভালবাসা দেবার মানুষ।
নাতি টা আমার কালের স্রোতে গা ভাসিয়েছে। দাদীকে সে সেভাবে টানেনা। কখনো ডেকেও দুই দন্ড কাছে বসাতে পারিনি ওকে।
ওদের জেনারেশন এর অতো সময় কই থাকে!
যুগটা এখন স্বার্থপরদের দখলে। ভেতরের অনুভূতি গুলো মিইয়ে যাচ্ছে এদের। এরা না ভাবে দেশের কথা না ভাবলো দশের!
অথচ আমাদের সময়ে আমরা তো সব ই উৎসর্গ করেছিলাম দেশের জন্যে। মায়ের জন্যে। মায়ের ভাষার জন্যে!
ভাষার কথা বললেই কেমন যেন স্মৃতি চাঙা হয়ে উঠে। ৬৬ বছর আগে ত্যাগসুখ লাভের সেই রক্তে ভেজা দুপুরের কথা। যে কৈশোরে আমি হারিয়ে ছিলাম আমার জামিলের বাবা কে। ত্যাগস্বীকার করে লাভ করে ছিলাম মুক্ত বাতাসে বাংলা উচ্চারণ এর। এরা তা বুঝবে না।
আজ রুম্মান জন্মদিন। এই একটা দিনের অপেক্ষায় থাকি আমি বছরের বাকিটা সময়। এ দিন টায় নাতি আমার ঘরে আসে। সবার সাথে বসে সময় দেয়। আমাকে ধরে ছাদে নিয়ে যায়,পাশে বসে গল্প করে। তবু যেন প্রাণ ভরেনা আমার!
ওর ডাকে আমি কোনো মায়া খুজে পাইনা। পাশ্চাত্য সম্বোধন আমার ভাল লাগেনা। নাতি আমায় "দাদি" ডাকেনা, গ্রান্ডমা ডাকে। সে ডাকে কেমন অস্বস্তি হয় আমার। আজকাল তো ধৈর্য শক্তি কমে গেছে । তাই বার বার অই ডাকে উস খুস করে ভেতর টা।
বুঝদার নাতি আমার ধরতে পারে সব। হয়ত আমার ঘোলাটে চোখে ও অস্থিরতা খুজে পায়।নিজে থেকেই রুম্মান আমায় জিজ্ঞেস করে
- গ্রান্ডমা,তুমি কি কিছু বলবে?
-না গো দাদুভাই।
-না,তুমি খুব অস্থির অস্থির হয়ে উঠেছো।
-তুমি আমায় দাদি ডাকোনা কেন দাদুভাই?
অসম্ভব বিতৃষ্ণায় মুখ বাকা করে ফেলল রুম্মান।
-দাদি তো খুব ওল্ড ওয়ার্ড গ্রান্ডমা। "গ্রান্ডমা" শব্দ টা আধুনিক। সময়ের সাথে তাল মেলাতে শেখো তুমি। তোমার সব কিছুই কেমন বাংগালী ভাব। জানো মডার্ন ওয়াল্ড এসব চায় না।
নাতি খুব একটা বাংলা বলেনা। আমি নিতান্ত বুঝিনা বলেই বাংলায় বলতে হয় ওকে। 'মডার্ন ওয়ার্ল্ড' যা চায় আর কী! অথচ এক সময় ছিলো যখন আমরা অন্য কিছু চেয়েছিলাম। শুদ্ধ পরিমার্জিত বাংলা বলার স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার। তাজা প্রানের বিনিময়ে কেড়ে এনেছিলাম সে অধিকার। এরা কী তা জানেনা! আসছে ২১শে ফেব্রুয়ারি এরা কালো সাদায় সেজে ঘুরে বেড়ায়। অথচ এই একুশে ফেব্রুয়ারি ই তো আমরা বাহান্ন কে বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করতে পেরেছিলাম।
দাদুভাইকে বললাম
- শেষ বয়সে, এই শেষ সময়ে আমার একটা শখ পূরন দেবে দাদু?
- বলো
- ২১শে ফেব্রুয়ারি তুমি আমায় হুইল চেয়ারের সাহায্যে কেন্দ্রিয় শহিদ মিনার এ নিয়ে যাবে?
- আচ্ছা ঠিকাছে।
এত সহজে ও রাজি হবে বুঝতেই পারিনি।
২১শে ফেব্রুয়ারি ভোরেই আমাকে তৈরি করে গাড়িতে নিয়ে বসিয়ে পাশেই দাদুভাই বসে পড়লো। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম-
- একুশ কেন অমর জানো দাদু?
- হোয়াই নট গ্রান্ডমা? ইটস আওয়ার মাদার ল্যাংগুয়েজ ডেই!
- কিন্তু একুশের গভীরতা কি জানো? একুশের সাথে মিশে আছে আমার স্মৃতি!
- আই ফিল কিউরিসিটি, বল তুমি তোমার একুশ এর গল্প খানা।"


"এ কোনো গল্প নয় গো। একুশে যে মিশে আছে আমার আপনজনেরা।। তোমার দাদু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ও অফিসের কর্মী। তখনকার দিনে মেয়ে গুলো বেশির ভাগ অল্প বয়সেই বিয়ের পিড়িতে বসতো। আমাকে ১৫ পেরুবার আগেই তোমার দাদুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিলো।
তোমার দাদু খুব সুন্দর ছিলেন।যেমন টা সুন্দর পেয়েছ তোমার বাবা ও তুমি! '৫১ তে আমি ১৬ তে পা দিলাম। উঠতি বয়সের স্বভাবসুলভ চঞ্চল কিশোরী ছিলাম,তাই নানা আবদার মেটাতে তোমার দাদুকে ব্যস্ত করে তুলতাম। তোমার দাদু ছিলেন এক নির্ভেজাল ঠান্ডা মানুষ। সারাদিন ক্যাম্পাসে আর মিটিং শেষে আমার দুষ্টি মিস্টি আবদার মানতো হাসি মুখে।
--- কিসের মিটিং? রুম্মান বলে উঠলো।
- "সে কথাই বলছি। সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পরে ব্রিটিশ এসে বাসা বাধে ভারত এ।
১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গেলেও ভারতবর্ষকে দ্বি-খন্ডিত করে যায়। একদিকে পাকিস্তান অপরদিকে ভারত। পাকিস্তানের আবার দু‘ভাগ হয়, পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল বেশী এবং তাদের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল তুলনামুলকভাবে কম এবং তাদের ভাষা ছিল উর্দু।
তা'সত্ত্বেও, পাকিস্তানের জনক নামে খ্যাত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজে ঢাকায় বাংলা ভাষার ওপর আক্রমন পরিচালনা করেন। তিনি ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার পূর্বে ঘোষণা করেন যে,
“উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।”
তার কথার উত্তরে ঘটনাস্থলেই দু’জন ছাত্র বলেছিলেন, “না, না, না।”
তার এই কথার বিরুদ্বে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ রুখে দাঁড়ায়। তারা মাতৃভাষার স্বাধীনতা চায়। আর সে থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মাতৃভাষা নিয়ে দাঙ্গা শুরু হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের নানাভাবে ঠকাতো। পূর্ব পাকিস্তানে পাট জন্মাতো। অথচ সস্থায় এখান থেকে পাট কিনে নিয়ে তারা নিজ এলাকায় জুট মিল বানিয়ে সেখানে পাটের জিনিস তৈরি করে পূর্ব পাকিস্তানে চড়া দামে বিক্রি করতো। এরূপ আরো উদাহরণ আছে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মাতৃভাষার স্বাধীনতার জন্যই তাদের বিরুদ্ধে প্রথম লড়ে।
১৯৫২ সালের কথা;
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মাতৃভাষার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের ডাক দেয়।
পশ্চিমা সরকার পাকিস্তানী মিলিটারীদের বলে দেয়, রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারি করতে। মিছিলের লোক দেখলেই যেন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় মিছিল বের করে। তাদের সঙ্গে সাধারন জনগণও যোগ দেয়। আর তাদের মধ্যে ছিলেন তোমার দাদু ও। তখন আমি ৪ মাসের অন্তসত্বা! সেদিন ছিল, ৮ ফাল্গুন।
তোমার দাদু বলেছিলেন, " আজ যদি বাংলা কে কেড়ে নেয়,আমাদের সন্তান এসে বাংলায় তোমাকে মা ডাকতে পারবেনা। আমাদের মায়ের ভাষার উপর হাত দিয়েছে সরকার। কেড়ে নিতে দেবোনা। আজ আমায় আটকিও না নিলুফা। পাকিস্তান সরকার কে রূখতে হবে, এ অন্যায় হতে দেয়া যাবেনা। আমি ফিরে আসবো মিছিল শেষেই। তুমি অপেক্ষায় থেকো। বাংলা কে বুকে ধরে তবেই ঘরে ফিরবো , উর্দুকে নয়।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী এই মাতৃভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিলিটারীরা গুলি ছুঁড়ে, ছাত্রদের হত্যা করার জন্য। এতে মারা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিক, শফিক,বরকতসহ জব্বার ও সালামের মত আরো অনেক জনগণ। খবর এসেছিলো এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ দের মাধ্যমে। আমার অপেক্ষার প্রহর শেষ হলোনা। তোমার দাদু ছিলেন মিছিলের সামনের দিকে। মিছিল ছত্র ভঙ্গ করতে পুলিশের গুলি চলবার কালে একটার পর একটা বুলেট এসে তোমার দাদুর বুক ছারখার করে দিয়ে যায়। মাটিতে শুয়ে পড়েছিলো সেখানেই। হয়তো বা তার বুক থেকে গড়িয়ে যাওয়া রক্ত স্রোতে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন বাংলা আসছে ভেসে তার রক্ত স্রোতে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। নানা নির্যাতন সত্ত্বেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুণরায় রাজপথে নেমে আসে। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করে।
ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অণুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তখন থেকে প্রতি বছর এ দিনটি জাতীয় ‘শোক দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।। অথচ কালের ধারায় তোমরা চলে গিয়েছো উলটো পথে। তোমাদের কাছে একুশ একটি সরকারি ছুটির দিন। অথচ বিগত ৬৬ বছর ধরে একুশ আমার অহংকার।"
-"দেখ দাদি শহিদ মিনার এসে গেছি।" আমি রুম্মান এর দিকে তাকিয়ে আছি। -"ও আমায় ডাকলো? "
রুম্মান টার চোখ ভিজে এসেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম
- কি হয়েছে দাদু ভাই?
-বাংলা আমার অলংকার একুশ আমার অহংকার। চলো দাদি নেমে যাই গাড়ি থেকে।"
গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসলাম। পেছনে চেয়ার ঠেলে রুম্মান আমায় নিয়ে যাচ্ছে শহিদ মিনারের দিকে। রুম্মান ফুল কিনেছে। হয়ত সকল ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে,অথবা বাংলা কে নতুন ভাবে বরণ এর! ∆

উম্মে আওয়ারা চাদনী
অনার্স ২য় বর্ষ
ইংরেজি বিভাগ
রোল -১৬১০১৪

Comments